ছাতনা, বাঁকুড়া: এক টুকরো খবরের কাগজের একটা ছবি আর মেয়ের ফুটবল খেলার বায়না।সেই থেকেই শুরু রূপকথা, ছাতনার ভারতী মুদি আজ অসংখ্য ফুটবল কন্যার রূপকার।লালমাটির জেলা বাঁকুড়ার ছাতনা ব্লকের দুমদুমি গ্রাম। পরণে সাধারণ আটপৌরে শাড়ি, পায়ে জুতো আর মুখে তীব্র আত্মবিশ্বাস নিয়ে যখন তিনি মাঠের মাঝখানে নির্দেশ দেন, তখন এক অনন্য দৃশ্যের জন্ম হয়। তিনি ভারতী মুদি। কোনো বাঁধাধরা সুযোগ-সুবিধা বা আধুনিক পরিকাঠামো ছাড়াই কেবল অদম্য জেদকে সম্বল করে যিনি আজ জঙ্গলমহলের মেয়েদের ফুটবল কোচিংয়ের এক পরিচিত মুখ। সামাজিক মাধ্যমে তিনি এখন বিপুল জনপ্রিয়, তাঁর এই লড়াই ছুঁয়ে গিয়েছে আন্তর্জাতিক মহলকেও। সুদূর জার্মানি থেকেও ফুটবলপ্রেমীরা ছুটে এসেছেন এই আদিবাসী নারীর সংগ্রামকে কুর্নিশ জানাতে। তবে এই রূপকথার মতো যাত্রার সূচনাটা কিন্তু কোনো পরিকল্পিত সিদ্ধান্ত থেকে হয়নি, বরঞ্চ তার জীবন বদলে দিয়েছিল খবরের কাগজের মাত্র একটি সাধারণ ছবি। জানেন কিভাবে তিনি হলেন ফুটবলের কোচ ?
ফিরে যাওয়া যাক নব্বইয়ের দশকে। তখন ভারতী দেবীর মেয়ে তানিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রী। একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে একটি সংবাদপত্রের ছেঁড়া টুকরো কুড়িয়ে বাড়ি নিয়ে আসে সে। কাগজের পাতায় ছাপা ছিল কয়েকজন মেয়ের ফুটবল খেলার একটি দৃশ্য। সেই ছবি দেখেই মায়ের কাছে খেলার তীব্র বায়না শুরু করে ছোট্ট তানিয়া। সাধারণ গ্রামীণ পরিবারের মা হিসেবে ভারতী দেবী তখন মেয়েকে বুঝিয়েছিলেন, ফুটবল তো আর একা খেলা যায় না, তার জন্য অন্তত বাইশ জন খেলোয়াড় চাই। কিন্তু সেই কথায় দমে যায়নি মেয়ে। ছুটির পর একদল সহপাঠীকে একজোট করে সোজা বাড়ি নিয়ে হাজির হয় সে সকলেই ফুটবল খেলতে চায়। মেয়ের এই অদম্য উৎসাহ আর ফেরাতে পারেননি ভারতী মুদি। সেই প্রথম গ্রামের মেঠো মাঠে দল বেঁধে নেমেছিলেন তিনি।
সেই যে শুরু, তারপর আর কখনও পেছনে তাকাতে হয়নি তাঁকে। নিজের কোনো প্রথাগত প্রশিক্ষণ না থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনিই হয়ে উঠেছেন খুদে ফুটবলারদের পথপ্রদর্শক। গ্রাম্য প্রতিকূলতা ও আর্থিক অনটনকে তুচ্ছ করে দুমদুমি গ্রামের সেই খোলা মাঠ থেকেই একের পর এক প্রতিভা তুলে এনেছেন তিনি। তাঁর হাত ধরে ফুটবল শেখা বহু মেয়ে আজ রাজ্যের ও দেশের নামীদামি ক্লাবের জার্সি গায়ে মাঠ কাঁপাচ্ছে, অনেকেই ক্রীড়া কোটায় সরকারি চাকরি পেয়ে নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের পিছিয়ে পড়া পরিবারের কন্যাদের কাছে ভারতী দেবী এখন কেবল একজন কোচ নন, আত্মনির্ভরতা ও নতুন স্বপ্নের অপর নাম।
আজ তাঁর পরিচিতির পরিধি হয়তো কাঁটাতার পেরিয়ে বিশ্বমঞ্চেও পৌঁছেছে, ভবিষ্যৎ তাঁকে আরও বৃহত্তর সম্মানের দিকে নিয়ে যাবে। কিন্তু এই সুবিশাল সাফল্যের শিকড় আজও পোঁতা রয়েছে সেই তিন দশক আগের খবরের কাগজের ধুলোমাখা টুকরোটিতে, যা সেদিন একটি ছোট্ট মেয়ের স্বপ্নের জন্ম দিয়ে গ্রামীণ ফুটবলের গোটা ইতিহাসটাই বদলে দিয়েছিল।