সাতসকালের শান্ত গ্রামটা আচমকাই যেন গ্যাস চেম্বারে পরিণত হলো।ভোরে অন্ডালের সিঁদুলি এলাকায় কয়লাখনির ফাটল বেয়ে বেরিয়ে আসা ঝাঁঝালো গ্যাসে কার্যত দমবন্ধ হওয়ার উপক্রম হয় বাসিন্দাদের। প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়ে বুক ধড়ফড় আর তীব্র শ্বাসকষ্টে দিশেহারা হয়ে ঘরে ছোটেন সাধারণ মানুষ। ভূগর্ভস্থ খনির কারিগরি ত্রুটি ও জলের আকস্মিক তোড়ে নির্গত হওয়া মিথেন গ্যাসের জেরে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন দুই খনি শ্রমিক। বরাতের জোরে প্রাণরক্ষা পেলেও কোলিয়ারি কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত নজরদারিহীনতার বিরুদ্ধে ফুঁসছে গোটা সিঁদুলি।
স্থানীয় ও খনি সূত্রে জানা গিয়েছে, ঘটনার সূত্রপাত রবি ও সোমবারের সংযোগস্থলে, ভূগর্ভে জমে থাকা জলকে কেন্দ্র করে। কয়লাখনি থেকে জল বাইরে বের করার জন্য পাম্পিং স্টেশনের একটি অংশে বিপুল পরিমাণ জল আটকে রাখা হয়েছিল। সোমবার ভোরে কোনো কারণে সেই সংরক্ষিত জলপ্রবাহ প্রবল বেগে খনিগর্ভের মূল অংশে আছড়ে পড়ে। জলের এই আকস্মিক চাপ ও ধাক্কায় মাটির নিচের ফাঁকফোকড়ে আটকে থাকা মারাত্মক মিথেন গ্যাস প্রচণ্ড গতিতে ওপরের দিকে উঠে আসতে শুরু করে।
রবিবার রাত হওয়ায় খনিতে শ্রমিকের সংখ্যা কিছুটা কম ছিল। নাইট শিফটের কাজ শেষ করে সিংহভাগ কর্মী ততক্ষণে ওপরে উঠে এসেছিলেন। কিন্তু তখনও শেষ মুহূর্তের কাজ সারছিলেন দুই শ্রমিক। আকস্মিক বিষাক্ত গ্যাস ও জলের তোড়ে তারা খনিগর্ভেই জ্ঞান হারানোর মতো অবস্থায় পৌঁছান। তবে বিপদ টের পেয়েই উপরে থাকা অন্য শ্রমিকরা নিজেদের প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে তৎপরতার সঙ্গে নিচে নামেন এবং সংজ্ঞাহীন অবস্থায় দু'জনকে উদ্ধার করে বাইরে আনেন।
এদিকে খনিগর্ভ ছাড়িয়ে সেই গ্যাস গ্রামের ফাটল ও উন্মুক্ত মাটি দিয়ে গোটা সিঁদুলিতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। চারদিকে চোখ-গলা জ্বালা করা তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধের সঙ্গে ধোঁয়াশা তৈরি হয়। প্রাতঃভ্রমণকারীরা অসুস্থ বোধ করে যে যার বাড়িতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। অভিযোগ, দুর্ঘটনার খবর জানাজানি হওয়ার পরেও বহুক্ষণ ঘটনাস্থলে ইস্টার্ন কোলফিল্ড লিমিটেড (ইসিএল)-এর কোনো উচ্চপদস্থ কর্তা পৌঁছাননি। কর্তৃপক্ষের এমন উদাসীনতায় ক্ষোভ উগরে দেন গ্রামবাসীরা।
প্রকাশ শর্মা নামে এক খনি কর্মীর কথায়, “সকালে মাটি ফুঁড়ে গ্যাস বেরোতে দেখে মানুষ ঘরবন্দি হয়ে পড়ে। এত বড় বিপদ ঘটে গেল, অথচ প্রথমদিকে কোনো আধিকারিকের দেখা নেই। পরে যখন ক্ষোভ চরমে ওঠে, তখন কোলিয়ারির ম্যানেজার আর এজেন্ট এসে পরিস্থিতি দেখার নামে দায় সারেন।”
পরে অবশ্য পরিস্থিতি সামলাতে এলাকা পরিদর্শনে নামেন ইসিএলের ইঞ্জিনিয়ার ও আধিকারিকরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইসিএল কর্তার দাবি, “আটকে থাকা জল হঠাৎ খনির ভিতরে ঢুকে পড়ার কারণেই চাপ তৈরি হয়ে মিথেন নির্গমন হয়েছিল। দুজন শ্রমিককে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। গ্রামে গ্যাস ছড়িয়ে পড়ার খবর পেয়েই প্রযুক্তিগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে।”
কর্তৃপক্ষ বিপদ কেটে যাওয়ার আশ্বাস দিলেও সিঁদুলির বাতাস থেকে ভয়ের মেঘ কাটেনি। মাটির নিচে ঠিকমতো সুরক্ষা ব্যবস্থা না নিয়ে কীভাবে কাজ চলছে, সেই প্রশ্ন তুলে স্থায়ী নজরদারি ও ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।