Monday, November 2, 2026
দক্ষিণবঙ্গ

মায়ের স্বপ্নাদেশে শুরু হয়েছিল পুজো, তারপরেই চালাঘর থেকে জমিদার হয়ে ওঠে বাঁকুড়ার সিট পরিবার

Published by Newz4 Admin |
মহম্মদ শাহজাহান আনসারী Posted by মহম্মদ শাহজাহান আনসারী
- October 04, 2026
— বিজ্ঞাপন —
Advertisement
মায়ের স্বপ্নাদেশে শুরু হয়েছিল পুজো, তারপরেই চালাঘর থেকে জমিদার হয়ে ওঠে বাঁকুড়ার সিট পরিবার

বাঁকুড়া, মহম্মদ শাহজাহান আনসারী, বাঁকুড়া: জঙ্গলে গরু-মোষ চরাতে গিয়ে স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন মা দুর্গার। সেই স্বপ্নাদেশের পরই শুরু হয়েছিল দেবীর আরাধনা। কথিত আছে, পুজো শুরু করার পরই ঘুরে দাঁড়ায় ভাগ্য। ছোট চালাঘর থেকে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে জমিদারবাড়ি। দেখতে দেখতে পেরিয়ে গিয়েছে সাড়ে তিনশো বছর। আজও প্রাচীন রীতি-নীতি মেনে নিষ্ঠা ও ভক্তির সঙ্গে পুজিতা হন দেবী দুর্গা।

বাঁকুড়া-২ ব্লকের কোষ্টিয়া গ্রামের সিট জমিদারবাড়ির দুর্গাপুজো আজও এলাকার অন্যতম আকর্ষণ। একসময় বিশাল জমিদারি, বড় বড় দালান এবং দুর্গাদালানের জৌলুসে মুখর থাকত গোটা এলাকা। সময়ের সঙ্গে জমিদারির অনেক সম্পত্তি সরকারের অধীনে চলে গিয়েছে। তবুও ঐতিহ্যের সেই পুজো আজও অমলিন।

সিট পরিবারের অন্যতম সদস্য মিনাল কান্তি সিট জানান, এই পুজোর সূচনা জমিদার সার্থক সিট ও তার ছেলেদের হাত ধরে। তখন তাঁর আর্থিক অবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না। জঙ্গলে গরু-মোষ চরাতে গিয়ে তিনি মা দুর্গার স্বপ্নাদেশ পান। এরপরই শুরু করেন দেবীর পুজো। পরিবারের বিশ্বাস, পুজো শুরু হওয়ার পর থেকেই সার্থক সিটের সুদিন ফিরতে শুরু করে। ধীরে ধীরে ছোট চালাঘরের জায়গায় তৈরি হয় বাড়িঘর, গড়ে ওঠে জমিদারি।

বর্তমানে জমিদারির আগের সেই বিস্তৃতি না থাকলেও প্রায় ৫০ থেকে ৬০ বিঘা জমি, পুকুর-সহ কিছু সম্পত্তি এখনও রয়েছে পরিবারের হাতে। তবে সম্পত্তির জৌলুস কমলেও দুর্গাপুজোর নিষ্ঠা ও আভিজাত্যে এতটুকু ভাটা পড়েনি।

এই পুজোর অন্যতম বিশেষত্ব অষ্টমীর বলি। প্রাচীন রীতি মেনে এখনও কুমড়ো ও আখ বলি দেওয়ার প্রথা রয়েছে। পুজোর পাঁচ দিন পরিবারের সদস্যরা একত্রিত হন। কলকাতা, আসানসোল-সহ বিভিন্ন জায়গায় থাকা পরিবারের সদস্যরাও পুজোর টানে ফিরে আসেন নিজেদের ভিটেয়। তাঁদের সঙ্গে উৎসবে সামিল হন স্থানীয় বাসিন্দারাও।

একসময় এই পুজোকে ঘিরে ছিল আরও বড় আয়োজন। গ্রামবাসী  নিবাঋন্দু কারক  জানান, আগে সাত গ্রামের ব্রাহ্মণ এবং আশপাশের প্রায় ১৬টি গ্রামের মানুষ এই বাড়ির পুজোয় আসতেন। জমিদারির বিস্তৃতিও ছিল বিশাল। তাঁর কথায়, একসময় এলাকায় প্রায় ২২ হাজার বিঘা জঙ্গল ছিল বলে প্রবীণদের কাছে শুনেছেন। সেই সময়ে আশপাশে তেমন দুর্গাপুজোও হতো না।

এখন সময় বদলেছে। আশপাশের বহু গ্রামেই শুরু হয়েছে দুর্গাপুজো। কমেছে জমিদারবাড়ির পুরনো জৌলুসও। কিন্তু সিট জমিদারবাড়ির পুজোর আবেদন এখনও আলাদা। কারণ এই পুজো শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কয়েক শতকের ইতিহাস, পারিবারিক ঐতিহ্য, লোকবিশ্বাস এবং এলাকার মানুষের আবেগ।

তাই পুজোর ক'দিন সিট জমিদারবাড়ির প্রাচীন দুর্গাদালান হয়ে ওঠে মিলনক্ষেত্র। আশপাশের গ্রাম তো বটেই, দূরবর্তী জেলা এমনকী ভিনরাজ্য থেকেও মানুষ আসেন ৩৫০ বছরের পুরনো এই পুজোর সাক্ষী হতে। জমিদারির জৌলুস হয়তো আগের মতো নেই, কিন্তু সার্থক সিটের সেই স্বপ্নাদেশে শুরু হওয়া দেবী আরাধনা আজও বহন করে চলেছে অতীতের গৌরব ও বিশ্বাসের উত্তরাধিকার।

— বিজ্ঞাপন —
Advertisement