পিউ নন্দী, পুরুলিয়া: বয়সের সঙ্গে অনেকের জীবন যখন ধীরে ধীরে থেমে আসে, তখন পুরুলিয়ার জ্যোৎস্না সরকার যেন ঠিক তার উল্টো পথেই হাঁটছেন। ৭৪ বছর বয়সেও কখনও হাতে ক্যারাটের গ্লাভস, কখনও কাঁধে স্যাক্সোফোন, আবার কখনও পিয়ানোর সামনে বসে সুর তুলছেন তিনি। জীবনের কঠিন সময়কে পিছনে ফেলে নিজের মতো করে নতুন করে বাঁচার গল্প লিখছেন এই প্রবীণা।
জ্যোৎস্নার জীবনের পথ অবশ্য সবসময় এতটা সহজ ছিল না। ২০১০ সালে স্বামীকে হারানোর পর একাকিত্ব গ্রাস করেছিল তাঁকে। এরপর ২০১২ সালে ছেলেকেও হারান তিনি। পরপর দুই প্রিয়জনকে হারিয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন জ্যোৎস্না। সেই কঠিন সময় থেকেই ধীরে ধীরে নিজেকে ব্যস্ত রাখার এবং নিজের ভয়-দুর্বলতাকে জয় করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
এরপর ২০২১ সালে পুরুলিয়ার অ্যাডভান্স ক্যারাটে অ্যাকাডেমিতে শুরু করেন ক্যারাটের প্রশিক্ষণ। তখন তাঁর বয়স সত্তরের কোঠায়। বয়সকে বাধা না বানিয়ে তরুণদের সঙ্গে তাল মিলিয়েই শুরু হয় অনুশীলন। নিয়মিত পরিশ্রম আর অধ্যবসায়ের মাধ্যমে ধাপে ধাপে এগিয়ে গিয়ে অর্জন করেন আপার ব্রাউন বেল্ট। শুধু তাই নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার পাশাপাশি ২০২৩ সালে জাপানে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপেও অংশ নিয়েছেন তিনি।
তবে জ্যোৎস্নার গল্প শুধু ক্যারাটে ঘিরে নয়। নিজেকে ব্যস্ত রাখতে সুরের জগতেও ডুব দিয়েছেন তিনি। শখ থেকে শেখা স্যাক্সোফোন এখন তাঁর অন্যতম পরিচয়। পিয়ানো বাজানোর পাশাপাশি সাঁতারেও রয়েছে তাঁর দক্ষতা। বর্তমানে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে স্যাক্সোফোন বাজানোর জন্য তাঁকে ডাকও আসে।
জ্যোৎস্না সরকার জানান, স্বামী ও ছেলেকে হারানোর পর একটা সময় তিনি খুব একা হয়ে পড়েছিলেন। নিজের সেই দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতেই ক্যারাটে শেখা শুরু করেন। পাশাপাশি পিয়ানো ও স্যাক্সোফোনের মতো নানা কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখেন। তাঁর কথায়, বয়স কোনও কাজ শেখার পথে বাধা হওয়া উচিত নয়। নতুন কিছু করার ইচ্ছেটাই আসল।
৭৪ বছর বয়সে দাঁড়িয়ে জ্যোৎস্না সরকার তাই যেন নিঃশব্দেই বলে চলেছেন—জীবন থেমে যাওয়ার কোনও নির্দিষ্ট বয়স নেই। কখনও ক্যারাটের অনুশীলনে, কখনও স্যাক্সোফোনের সুরে—নিজের মতো করে সেই নতুন জীবনের ছন্দ খুঁজে নিয়েছেন পুরুলিয়ার জ্যোৎস্না।