Saturday, October 31, 2026
কলকাতা

জমিদারের হারানো স্বর্ণমুদ্রা, তান্ত্রিক রামচরণের ভবিষ্যদ্বাণী! ৪৩২ বছর ধরে জ্বলছে শাস্ত্রী বাড়ির পুজোর আলো

Published by Newz4 Admin |
সুমন সাহা Posted by সুমন সাহা
- October 12, 2026
— বিজ্ঞাপন —
Advertisement
জমিদারের হারানো স্বর্ণমুদ্রা, তান্ত্রিক রামচরণের ভবিষ্যদ্বাণী! ৪৩২ বছর ধরে জ্বলছে শাস্ত্রী বাড়ির পুজোর আলো

নিউজ ফোর দক্ষিণ বারাসাত: তখনও দক্ষিণ ২৪ পরগনার এই বিস্তীর্ণ এলাকা আজকের মতো জনবহুল হয়ে ওঠেনি। চারদিকে ঘন জঙ্গল। জনবসতি হাতে গোনা। পাকা রাস্তা তো দূরের কথা, এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার অন্যতম ভরসা ছিল নদীপথ। লোকমুখে প্রচলিত, বারুইপুর থেকে জয়নগর হয়ে দক্ষিণ বিষ্ণুপুরের মহাশ্মশান পর্যন্ত প্রবাহিত ছিল আদি গঙ্গার একটি ধারা। সেই জলপথে নৌকা নিয়ে চলতেন ব্যবসায়ী, সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে জমিদাররাও।সেই জঙ্গলঘেরা সময়েই দক্ষিণ বারাসতের মাটিতে নিজের সাধনভূমি তৈরি করেছিলেন এক তান্ত্রিক—রামচরণ ভট্টাচার্য। তন্ত্রসাধনায় তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল বিস্তীর্ণ এলাকায়। তাঁকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল নানা লোককথা। আর সেই রামচরণ ভট্টাচার্যকেই ঘিরে রয়েছে দক্ষিণ বারাসতের শাস্ত্রী বাড়ির ৪৩২ বছরের দুর্গাপুজোর ইতিহাসের অন্যতম চমকপ্রদ অধ্যায়।
পরিবারের দাবি, ১৫৯৩ সালে রামচরণ ভট্টাচার্যের হাত ধরেই শুরু হয়েছিল এই দুর্গাপুজো। তখন অবশ্য এই বাড়ির নাম ছিল ভট্টাচার্য বাড়ি। কয়েকশো বছর পর পরিবারেরই এক কৃতী সদস্যের পাণ্ডিত্য ও সম্মানের কারণে সেই বাড়ির পরিচয় বদলে যায়। ভট্টাচার্য বাড়ি হয়ে ওঠে শাস্ত্রী বাড়ি। কিন্তু পুজোর ইতিহাসের গোড়ায় আজও থেকে গিয়েছেন সেই রামচরণ ভট্টাচার্য।
জমিদারের স্বর্ণমুদ্রা হারানো থেকে শুরু রহস্যের শাস্ত্রী বাড়ির দুর্গাপুজোর ইতিহাস বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হয় একটি স্বর্ণমুদ্রার গল্প। ইতিহাসের নথির চেয়ে এই গল্প বেশি বেঁচে রয়েছে লোকমুখে। পরিবারের প্রবীণদের মুখে মুখে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ছড়িয়ে পড়েছে সেই কাহিনি।কথিত আছে, কয়েকশো বছর আগে এক জমিদার বিপুল পরিমাণ স্বর্ণমুদ্রা নিয়ে রাজার কাছে খাজনা দিতে যাচ্ছিলেন। দক্ষিণ বারাসতের জঙ্গলঘেরা পথ পেরোনোর সময় ডাকাতদের কবলে পড়েন তিনি। তাঁর সঙ্গে থাকা সমস্ত স্বর্ণমুদ্রা লুট হয়ে যায়। স্বর্ণমুদ্রা হারিয়ে কার্যত দিশেহারা হয়ে পড়েন জমিদার। কারণ সেই টাকা দিয়েই তাঁকে রাজার খাজনা মেটাতে হত। খাজনা দিতে না পারলে জমিদারিও হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা ছিল। শেষপর্যন্ত বিপদের সময় তিনি আশ্রয় নেন তৎকালীন খ্যাতনামা তান্ত্রিক রামচরণ ভট্টাচার্যের কাছে।লোককথা অনুযায়ী, জমিদার তাঁর কাছে সমস্ত ঘটনা খুলে বলেন। রামচরণ ভট্টাচার্য তখন তন্ত্রসাধনার মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পারেন বলে বিশ্বাস করা হয়। এরপর তিনি জমিদারকে একটি নির্দিষ্ট গাছের কথা বলেন। জানান, লুট হয়ে যাওয়া স্বর্ণমুদ্রা ওই গাছের তলায় রয়েছে।
রামচরণের কথায় ভরসা করে জমিদার সেই জায়গায় পৌঁছন। শুরু হয় খোঁজ। আর সেখানেই নাকি মাটির নীচ থেকে উদ্ধার হয় তাঁর হারিয়ে যাওয়া স্বর্ণমুদ্রা!
স্বর্ণমুদ্রা ফিরে পেয়ে জমিদার রাজার কাছে গিয়ে খাজনা মেটান। রক্ষা পায় তাঁর জমিদারি। এই ঘটনার পর রামচরণ ভট্টাচার্যের প্রতি তাঁর কৃতজ্ঞতা আরও বেড়ে যায়।কৃতজ্ঞ জমিদারের দানেই তৈরি সাধনভূমি লোকমুখে প্রচলিত, স্বর্ণমুদ্রা ফিরে পাওয়ার পর কৃতজ্ঞ জমিদার তাঁর জমিদারির একটি অংশ থেকে বেশ কিছু জমি রামচরণ ভট্টাচার্যকে দান করেন। সেই জমির উপরই নিজের বসতভিটে এবং সাধনভূমি তৈরি করেন রামচরণ।
জঙ্গল কেটে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে বসতি। তৈরি হয় দালানবাড়ি। আর সেই বাড়িতেই শুরু হয় দেবীর আরাধনা।
পরিবারের দাবি, ১৫৯৩ সালে রামচরণ ভট্টাচার্য নিজের হাতে দুর্গাপ্রতিমা তৈরি করে দেবী দুর্গার পুজো শুরু করেন। যেহেতু তিনি তন্ত্রসাধক ছিলেন, তাই তাঁর শুরু করা পুজোও ছিল তন্ত্রমতে।
রামচরণের তন্ত্রসাধনার প্রভাব পড়েছিল পুজোর প্রতিটি আচারেও। পরিবারের দাবি, পুজোর নিয়ম, মন্ত্র এবং বিভিন্ন আচারবিধি তিনি পুঁথিতে লিখে রেখে গিয়েছিলেন। সেই প্রাচীন পুঁথির রীতিই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অনুসরণ করে আসছেন পরিবারের সদস্যরা।
আজও পুজোর মন্ত্রোচ্চারণে সেই পুরনো পরম্পরার ছাপ রয়েছে। সময় বদলেছে, প্রজন্ম বদলেছে, কিন্তু রামচরণ ভট্টাচার্যের তৈরি করে যাওয়া পুজোর কাঠামোকে ধরে রেখেছে পরিবার।
তান্ত্রিক রামচরণের পুজোয় বলির রীতি শাস্ত্রী বাড়ির দুর্গাপুজোর আরও একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল বলিদানের প্রথা। বহু প্রাচীন পুজোয় সময়ের সঙ্গে বলির রীতি বন্ধ হয়ে গেলেও এই বাড়িতে এখনও সেই পরম্পরা বজায় রয়েছে।পরিবারের সদস্য নীলমণি ভট্টাচার্য জানান, রীতি মেনে মোট পাঁচটি পাঁঠা বলি দেওয়া হয়। তবে বলির পাঁঠা বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও রয়েছে নির্দিষ্ট নিয়ম। পাঁঠাটি হতে হবে সম্পূর্ণ কালো। শরীরে অন্য কোনও রঙের ছিটে থাকলে তা গ্রহণ করা হয় না।
শুধু পাঁঠা নয়, কুমড়ো এবং আখ বলিরও রীতি রয়েছে। তন্ত্রমতে শুরু হওয়া এই পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা প্রাচীন আচারগুলির অন্যতম অংশ হিসেবেই আজও তা পালন করা হয়।একসময় এই পুজোয় আমিষ ভোগের প্রচলন ছিল। বর্তমানে সেই রীতি বদলে গিয়েছে। এখন সপ্তমী, অষ্টমী এবং নবমীতে নিরামিষ ভোগ দেওয়া হয়। পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি স্থানীয় বহু মানুষও সেই ভোগ গ্রহণ করেন।ভট্টাচার্য বাড়ি থেকে শাস্ত্রী বাড়ি রামচরণ ভট্টাচার্যের হাত ধরে শুরু হওয়া এই পুজো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও কয়েক প্রজন্ম পেরিয়েছে। বদলেছে বাড়ির পরিচয়ও।পরিবারের অন্যতম কৃতী সদস্য ছিলেন আশুতোষ ভট্টাচার্য। তিনি কলকাতার সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর অসাধারণ পাণ্ডিত্য ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে। সম্মানিত হন ‘শাস্ত্রী’ এবং পরবর্তীকালে ‘মহামহোপাধ্যায়’ উপাধিতে।
১৯২৪ সালের ৩ জুন তিনি মহামহোপাধ্যায় উপাধি লাভ করেন। তাঁর এই অসামান্য সম্মানের পর থেকেই ভট্টাচার্য বাড়ি ধীরে ধীরে পরিচিত হতে শুরু করে ‘শাস্ত্রী বাড়ি’ নামে। সেই সঙ্গে পরিবারের ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপুজোর নামও হয়ে যায় শাস্ত্রী বাড়ির দুর্গাপুজো।১৯৩০ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় মৃত্যু হয় আশুতোষ ভট্টাচার্যের। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর ছেলেরাই পুজোর দায়িত্ব সামলান। পরবর্তীকালে তাঁর ছেলে পশুপতি ভট্টাচার্যের বংশধরেরা মূলত পুজোর দায়িত্ব গ্রহণ করেন।পশুপতির পাঁচ ছেলের মধ্যে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের ছেলে-মেয়েরা এখন পুজোর বিভিন্ন কাজে যুক্ত রয়েছেন। পরিবারের অন্যতম প্রবীণ সদস্য হিসেবে এখনও রয়েছেন পশুপতির ছেলে নীলমণি ভট্টাচার্য।পুজো এলেই মুছে যায় দূরত্ব সময় বদলেছে। পরিবারের সদস্যরাও ছড়িয়ে পড়েছেন বিভিন্ন জায়গায়। কেউ থাকেন কলকাতায়, কেউ আশপাশে, আবার কেউ কর্মসূত্রে ভিনরাজ্য কিংবা দেশের বাইরেও থাকেন।
কিন্তু দুর্গাপুজো এলেই সেই দূরত্ব আর থাকে না। কয়েকশো বছরের পুরনো বাড়িতে একত্রিত হন পরিবারের সদস্যরা। পুরনো বাড়ির উঠোনে ফিরে আসে উৎসবের আবহ। ঢাকের আওয়াজ, শঙ্খধ্বনি, ধূপের গন্ধ আর মন্ত্রোচ্চারণে যেন ফের জীবন্ত হয়ে ওঠে রামচরণ ভট্টাচার্যের সময়ের সেই দিনগুলি।ইতিহাস নেই, তবু স্মৃতিতে অমলিন রামচরণ।৪৩২ বছরের দীর্ঘ ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়ের লিখিত নথি আজ আর পরিবারের হাতে নেই। সময়ের সঙ্গে হারিয়ে গিয়েছে বহু ঘটনা। রামচরণ ভট্টাচার্যের তন্ত্রসাধনা, জমিদারের হারানো স্বর্ণমুদ্রা উদ্ধার এবং জমিদারের জমি দানের কাহিনিও মূলত লোককথা ও পারিবারিক স্মৃতির মধ্যেই বেঁচে রয়েছে।কিন্তু ইতিহাসের নথি না থাকলেও মানুষের স্মৃতি কখনও কখনও নিজেই হয়ে ওঠে ইতিহাসের বাহক। সেই স্মৃতিতেই আজও জীবন্ত রামচরণ ভট্টাচার্য।আদি গঙ্গার সেই জলধারা আজ নেই। নেই সেই ঘন জঙ্গল। জমিদারদের নৌকাও আর চলে না পুরনো জলপথে। বদলে গিয়েছে দক্ষিণ বারাসতের চেহারা। কিন্তু শাস্ত্রী বাড়ির অন্দরমহলে দুর্গাপুজোর সময় এখনও শোনা যায় প্রাচীন মন্ত্রোচ্চারণ।ঢাকের শব্দ উঠলেই যেন কয়েকশো বছরের সময়ের পর্দা সরে যায়। চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই তান্ত্রিক রামচরণের ছবি—যিনি জঙ্গলঘেরা দক্ষিণ বারাসতে সাধনভূমি গড়েছিলেন, যাঁকে ঘিরে রয়েছে জমিদারের হারানো স্বর্ণমুদ্রা উদ্ধারের রহস্যময় কাহিনি, আর যাঁর হাত ধরে শুরু হয়েছিল দেবী দুর্গার আরাধনা।শাস্ত্রী বাড়ির ৪৩২ বছরের দুর্গাপুজো তাই শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়। এটি রামচরণ ভট্টাচার্যের স্মৃতি, তন্ত্রসাধনার ঐতিহ্য, জমিদারি যুগের লোককথা এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলা এক পারিবারিক ইতিহাস।
সময় তার নিজের নিয়মে সবকিছু বদলে দিয়েছে। কিন্তু রামচরণ ভট্টাচার্যের শুরু করা সেই পুজোর প্রদীপ আজও জ্বলছে। আর সেই আলোতেই দক্ষিণ বারাসতের শাস্ত্রী বাড়ি প্রতি শরতে ফিরে পায় তার হারিয়ে যাওয়া কয়েকশো বছরের অতীত।

— বিজ্ঞাপন —
Advertisement