Monday, November 2, 2026
জেলা

অসুর নেই, শিবের কোলে দ্বিভুজা উমা,বড়শুলের দে বাড়িতে আড়াইশো বছরের হরগৌরী আরাধনা

Published by Newz4 Admin |
সায়নী সরকার Posted by সায়নী সরকার
- October 15, 2026
— বিজ্ঞাপন —
Advertisement
অসুর নেই, শিবের কোলে দ্বিভুজা উমা,বড়শুলের দে বাড়িতে আড়াইশো বছরের হরগৌরী আরাধনা

নিউজ ফোর বর্ধমান: শরতের আকাশে পেঁজা তুলোর মেঘ আর শিউলির গন্ধ জানান দিচ্ছে উমার আগমন বার্তা। জেলায় জেলায় বারোয়ারি পুজোর থিম ও মণ্ডপ তৈরির তোড়জোড় যখন তুঙ্গে, তখন সাবেক বনেদিয়ানার ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরে দুর্গাপুজোর প্রস্তুতিতে ব্যস্ত পূর্ব বর্ধমানের বড়শুলের প্রাচীন ‘দে’ পরিবার। এই বাড়ির পুজো মানেই ঐতিহ্যের এক বিরল মেলবন্ধন, যেখানে দেবী দুর্গা দশভুজা মহিষাসুরমর্দিনী নন, পূজিত হন শিবের বাম উরুতে আসীন দ্বিভুজা ‘হরগৌরী’ রূপে।


প্রায় আড়াইশো বছর ধরে চলে আসা এই পুজোয় দেবীর রূপের বৈশিষ্ট্য নজরকাড়া। এখানে কোনও অসুর নেই, নেই সিংহবাহিনী রূপও। দুর্গা, লক্ষ্মী কিংবা সরস্বতী কারও কোনও বাহন থাকে না এই প্রতিমায়। তবে দেবাদিদেব মহাদেব, কার্তিক এবং গণেশের বাহন যথারীতি উপস্থিত থাকে। শিবের পাশে শান্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকে তাঁর বাহন বৃষভ। রণংদেহী রূপের বদলে দে বাড়ির ঠাকুরদালানে ধরা দেয় পরম শান্ত ও পারিবারিক এক আবহ।

ইতিহাসের পাতা উল্টোলে জানা যায়, বড়শুলের জমিদার যাদবচন্দ্র দে-র আমলে প্রথমে ঘটে এই পুজোর সূচনা হয়েছিল। পরবর্তীতে জমিদার গৌরপ্রসাদ দে-র সময়ে মৃন্ময়ী মূর্তি পুজোর প্রচলন হয়। কথিত আছে, দামোদর নদ ও জিটি রোড সংলগ্ন হওয়ায় তৎকালীন সময়ে গঙ্গাসাগরগামী বহু সাধুসন্ত এই জমিদার বাড়িতে আশ্রয় নিতেন। তেমনই এক সাধুদল পরিবারে ধনসম্পদ ও শ্রীবৃদ্ধির কামনায় হরগৌরী রূপের আরাধনার পরামর্শ দেন। আরও একটি রোমাঞ্চকর লোকশ্রুতি রয়েছে সাধুরা একবার ঝোলা থেকে মা দুর্গার বিভিন্ন রূপের মাটির পুতুল বের করে দে পরিবারের এক শিশুকন্যার চোখ বেঁধে দেন। সেই কন্যা হাত বাড়িয়ে হরগৌরীর পুতুলটি তুলে নেয়। সেই থেকেই এই অভিনব রূপের প্রতিষ্ঠা।

বৈষ্ণব ভাবাপন্ন এই পরিবারে গুরুদেবের নির্দেশে শাক্ত মতে এবং ‘গুপ্তপ্রেস পঞ্জিকা’ মেনে পুজো সম্পন্ন হয়। নিয়ম অনুযায়ী সপ্তমীতে ছাঁচিকুমড়ো এবং অষ্টমীতে ছাগবলি দেওয়া হয়। নবমীতে তিনটি ছাঁচিকুমড়ো, চারটি শসা, বাতাবি লেবু ও মূলসহ তিনটি আখ বলিদানের প্রথা রয়েছে। তবে বৈষ্ণব রীতির কারণে পরিবারের কেউ বলির প্রসাদ স্পর্শ করেন না। এককালে বর্ধমানের সর্বমঙ্গলা মন্দিরের সন্ধিপুজোর কামান দাগার আওয়াজ শুনে এখানে বলিদান শুরু হতো। তবে কামান দাগা বহু দশক আগে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন ঘড়ির সময় মেনেই সেই নিয়ম রক্ষা করা হয়।

এককালে দামোদর দিয়ে নৌবাণিজ্যে লবণ ও তাম্বুলের রমরমা ব্যবসা ছিল দে পরিবারের। ঠাকুরদালানের প্রবেশপথে শোভা পেত প্রায় এক কুইন্টাল ওজনের সুবিশাল এক ঘণ্টা। রেড়ির তেলের ঝাড়বাতির আলোয় উজ্জ্বল হয়ে উঠত গোটা মহল, আর নবমীর রাতে বসত ঐতিহ্যবাহী ‘বাঘ নাচ’-এর আসর। সময়ের প্রবাহে সেই ভারী ঘণ্টা, রেড়ির তেলের ঝাড়বাতি বা বাঘ নাচের জৌলুস অতীত হলেও ঐতিহ্যের ধারায় ছেদ পড়েনি এতটুকুও। বিজয়া দশমীতে আজও প্রাচীন প্রথা মেনে দেবীকে কাঁধে তুলে গোটা গ্রাম ঘুরিয়ে তবেই বিসর্জন দেওয়া হয়। আভিজাত্যের চাকচিক্য ফিকে হলেও পরিবারের আন্তরিকতা ও ভক্তিভাবকে সম্বল করে আজও স্বমহিমায় উজ্জ্বল বড়শুলের এই হরগৌরী পুজো।

— বিজ্ঞাপন —
Advertisement