সায়নী সরকার: পশ্চিম বর্ধমান: শিশুর জ্ঞান ফেরার আগেই তিনি নার্সিংহোম ছেড়ে চলে যান,শিশুর শারিরীক অবস্থার অবনতি হলেও তিনি আসেননি বলে অভিযোগ।গ্রেফতার অ্যানাসথেসিস্ট বনজ কুমার দে।
চিকিৎসায় গাফিলতিতে চার বছরের শিশুমৃত্যুর ঘটনায় অভিযুক্ত ভুয়ো চিকিৎসক শেখ সাইদুল হক-কে গ্রেফতারের পর, এবার পুলিশের জালে ধরা পড়লেন অ্যানাসথেসিস্ট বনজ কুমার দে।
সোমবার বীরভূমের শান্তিনিকেতন থানা এলাকার একটি বিলাসবহুল রিসর্ট থেকে তাঁকে গ্রেফতার করে বর্ধমান থানার পুলিশ।
মঙ্গলবার ধৃত চিকিৎসককে বর্ধমান আদালতে পেশ করা হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে,গত ২ সেপ্টেম্বর ৪ বছরের শিশু অরণ্য রায়ের ফাইমোসিস অপারেশনের জন্য অ্যানাসথেসিয়া প্রয়োগ করেন বনজ কুমার দে। অভিযোগ,শিশুটির জ্ঞান ফেরার আগেই নার্সিংহোম ছেড়ে চলে যান তিনি।
এমনকি শিশুটির শারিরীক অবস্থার অবনতি হলেও ‘অন্যত্র ব্যস্ততা’র অজুহাত দেখিয়ে আরেক চিকিৎসক ডা. স্বর্ণমুকুল সাহাকে বিষয়টি দেখতে বলেন।
এই মামলার তদন্তে নেমে পুলিশের হাতে আগেই উঠে এসেছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য।
গত ২ সেপ্টেম্বর পশ্চিম মেদিনীপুরের চন্দ্রকোনার বাসিন্দা জয়ন্ত রায় তাঁর চার বছরের সন্তান অরণ্যকে নবাবহাটের ‘লাইফ কেয়ার' নার্সিংহোমে ভর্তি করেন। তাঁদের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল অ্যানাসথেসিয়া ছাড়াই দ্রুত অপারেশন করে ছেড়ে দেওয়া হবে।
অভিযোগ, পরিবারের অনুমতি ছাড়াই যথেচ্ছভাবে অ্যানাসথেসিয়া প্রয়োগ ও ভুয়ো ডাক্তারের অসাবধান অস্ত্রোপচারের কারণে ওটি-তেই মৃত্যু হয় শিশুটির।
ঘটনার তদন্তে নেমে পুলিশ নার্সিংহোম থেকে ডিভিআর, সিসিটিভি ফুটেজ, অংশীদারি চুক্তিপত্র এবং ভুয়ো চিকিৎসকের সিলমোহর বাজেয়াপ্ত করে।
জেলা স্বাস্থ্য দপ্তর তদন্তে নেমে নার্সিংহোমের সমস্ত পরিষেবা অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়।
মৃত শিশুর পরিবারের তরফে চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগ তুলে নার্সিংহোম কর্তৃপক্ষ,চিকিৎসক সাইদুল হক, বনজ কুমার দে এবং সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়।
রাজ্য স্বাস্থ্য দপ্তরেও অভিযোগ জানায় শিশুটির পরিবার।
অন্যদিকে ,রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিল তদন্তে নেমে জানতে পারে সাইদুল হকের ডাক্তারি সংক্রান্ত যাবতীয় নথিপত্র সম্পূর্ণ ভুয়ো।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০০৮-২০০৯ সালে বেঙ্গালুরুতে ওয়ার্ড বয় হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে সে। এরপর ২০১০-১১ সালে দিল্লিতে ওটি অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করার সময় অস্ত্রোপচারের খুঁটিনাটি রপ্ত করে। পরবর্তীতে নয়ডায় কিছু দিন কাটিয়ে ২০১২-১৩ সাল নাগাদ কলকাতায় ফেরে সাইদুল।
এরপর বিহার থেকে মোটা টাকার বিনিময়ে ভুয়ো এমবিবিএস ডিগ্রি জোগার করে পশ্চিমবঙ্গ মেডিক্যাল কাউন্সিলে রেজিস্ট্রেশন করিয়ে নেয় সে। বর্ধমানের প্রায় ২৬টি নার্সিংহোমে অবাধে প্রতিদিন একাধিক জটিল অস্ত্রোপচার চালাত এই ভুয়ো চিকিৎসক।
শিশুমৃত্যুর ঘটনার পর জাল চক্রের পর্দাফাঁস হতেই দুবাইয়ে গা ঢাকা দিয়েছিল সাইদুল। তাঁর বিরুদ্ধে লুকআউট নোটিশ জারি করে বর্ধমান থানার পুলিশ। কয়েকদিন আগেই দুবাই থেকে দিল্লি বিমানবন্দরে নামামাত্রই বিমানবন্দর পুলিশ তাঁকে আটক করে। খবর পেয়ে বর্ধমান থানার বিশেষ টিম দিল্লি পৌঁছে সাইদুলকে গ্রেফতার করে।
ভুয়ো চিকিৎসক সাইদুল-কে গ্রেপ্তারের পরে সোমবার রাতে বোলপুর থেকে গ্রেফতার করা হয় অভিযুক্ত অ্যানাসথেসিস্ট বনজ কুমার দে-কে।
এই শিশুমৃত্যুর ঘটনায় এখনও পর্যন্ত ভুয়ো ডাক্তার সাইদুল হক, অ্যানাসথেসিস্ট বনজ কুমার দে ছাড়াও নার্সিংহোমের ৩ জন মালিক এবং ১ জন কর্মী সহ মোট ৬ জনকে গ্রেফতার করল বর্ধমান থানার পুলিশ।
ধৃত বনজ কুমার দে-কে মঙ্গলবার বর্ধমান আদালতে পেশ করে বর্ধমান থানার পুলিশ।