নিউজ ফোর বর্ধমান: ঢাকের আওয়াজে চেনা থিয়েটার হল গমগম করে উঠল। দর্শকাসনের ভিড় চিরে যখন কলাবউয়ের পালকিটা মঞ্চের দিকে এগোল, তখন ঘড়ির কাঁটায় মহালয়ার সন্ধ্যা। বার্নপুরের ভারতী ভবনে ঢুকে এক লহমায় বোঝার উপায় ছিল না, এটা নাটকের প্রেক্ষাগৃহ নাকি কোনো বর্ধিষ্ণু জমিদার বাড়ির ঠাকুরদালান! স্থানীয় নাট্যদল ‘ফিনিক্স’-এর হাত ধরে এভাবেই মঞ্চে নেমে এল আস্ত এক দুর্গাপুজো, যার সঙ্গে জড়িয়ে রইল কয়লাঞ্চলের অপরাধ আর রহস্যের টানটান জাল।
নাট্যকার উদয়ন চট্টোপাধ্যায়ের কলমে এবং অমিতাভ চট্টোপাধ্যায়ের নির্দেশনায় মঞ্চস্থ হলো নাটক ‘খারিজ’। গল্পের প্রেক্ষাপট অন্ডালের উখরা অঞ্চলের বনেদি রায়চৌধুরী বাড়ি। সপ্তমী থেকে দশমী, রীতিনীতি মেনে মঞ্চেই জীবন্ত হয়ে ওঠে নবপত্রিকা প্রবেশ, চণ্ডীপাঠ, সন্ধিপুজোর আরতি, নবমীর বলি এবং বিজয়ার সিঁদুরখেলা। তবে এই উৎসবমুখর পরিবেশেই নাটকে নেমে আসে আঁধার। সপ্তমীর দিন ভোগের রান্নার উনুন খুঁড়তেই মাটির নিচ থেকে বেরিয়ে আসে এক নরকঙ্কাল!
পুজোর মেজাজ নিমেষে বদলে যায় আতঙ্কে। সাবেক জমিদার বাড়ির অন্দরে হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়ে পুলিশ, দলছুট নেতা আর উৎসাহী সাংবাদিকদের দল। সেই সঙ্গে শুরু হয় পাড়াতুতো গুঞ্জন। উৎসবের আবহে কয়লাখনির আশপাশের জটিল সমাজবাস্তবতা, লোভ আর ভিটেমাটি হারানোর গল্প এক সুতোয় গেঁথে দর্শকদের শেষ পর্যন্ত টানটান উত্তেজনায় বেঁধে রাখে ফিনিক্সের কলাকুশলীদের অভিনয়।
তবে নাটকের রুদ্ধশ্বাস চিত্রনাট্যকেও যেন এক কদম ছাপিয়ে গিয়েছিল মঞ্চের দুর্গা প্রতিমা। ফেলে দেওয়া কার্ডবোর্ডের বাক্স, সাধারণ কাগজ আর বাতিল জিনিসপত্র দিয়ে তিন মাসের অক্লান্ত পরিশ্রমে এই সুবিশাল প্রতিমা গড়ে তুলেছেন শিল্পী রানা শর্মা। মাটির ছোঁয়াচ ছাড়াই নিখুঁত গোল মুখে ডাকের সাজের প্রতিমা দেখে মুগ্ধ আসানসোলের নাট্যপ্রেমীরা। পরিচালক অমিতাভ চট্টোপাধ্যায় জানালেন, এই শৈল্পিক মঞ্চসজ্জাই নাটকটিকে অন্য মাত্রা এনে দিয়েছে।
ক্লাইম্যাক্সের রেশ যখন কাটছে, তখন প্রেক্ষাগৃহজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এক অদ্ভুত মুগ্ধতা। তবে চমকের শেষ সেখানেই হয়নি। পর্দা নামতেই দর্শকদের হাতে তুলে দেওয়া হয় গরম গরম পোলাও আর আলুর দম,যা আয়োজকেরা ভালোবেসে নাম দিলেন ‘মঞ্চের ভোগ’। একদিকে রহস্যভেদের রোমাঞ্চ, অন্যদিকে ঢাকের বাদ্যি আর ভোগের গন্ধ দেবীপক্ষের সূচনায় এমন ভিন্ন স্বাদের থিয়েটার বহুদিন মনে রাখবে কয়লাঞ্চল।